[অনুগল্প] লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
[অনুগল্প] লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৬ মে, ২০১৬

মাসুম বিল্লাহ -এর অনুগল্প

ক্ষয়


নাভির নীচে শাড়ি পরলে সুন্দর লাগবে। নাস্তার টেবিলে কথাটা বলল কবির। আমি  কিছু বললাম না। ভেতরে ভেতরে চমকে উঠলাম। বিয়ের সতের দিনের মাথায় স্বামীর মুখ থেকে প্রথম একটা রোমান্টিক কথা শুনলাম। কবির পুরোটা নাস্তা কখনোই শেষ করে না। মনে হচ্ছিল আজ সময় লাগলেও পুরোটা শেষ করবে, কিন্তু ধারণা ঠিক হলো না। উঠে পড়ল। তারপর দ্বিতীয়বারের মতো চমকে দিয়ে বলল, ফারহানা, বাকিটুকু ফেলে না দিয়ে তুমি খেয়ে নিও যদি তোমার খারাপ না লাগে।
আমি শুধু মাথা নাড়লাম। কবির অফিসে চলে গেল।
মেয়েরা নাকি অল্পতে খুশি হতে জানে না। কথাটা হাজারবার শুনেছি। আজ আমার এত্ত খুশি লাগছে তা কাউকে বোঝাতে পারবো না। সব কথা তো আর সবাইকে খুলে বলা যায় না। বিয়ের পরের দিনই সাথি ফোন করে। তারপর ধাম করে প্রশ্ন করে বসে, কীরে ফারু সোনা, দুলাভাই ঠিক আছে তো?
বুঝতে না পেরে বলি, কী বলিস? 
তারপর সাথি যা বলেছে, শুনে কান গরম হয়ে গিয়েছিল।

বিয়ের রাতে সত্যিই আমি খুব আড়ষ্ট ছিলাম। হঠাৎ একটা অচেনা পুরুষ মানুষের সঙ্গে এক বিছানায়। বিয়ের আগে ভাবলেও আমার গা ঘিন ঘিন করত। ভাবটা বিয়ের প্রথম রাতেও ছিল। খুব ভয় পাচ্ছিলাম। আমার মনের কথা কবির বুঝতে পেরেছিল কিনা জানি না, নিজ থেকেই বলেছিল, রাত জাগবে নাকি ঘুমিয়ে পড়বে?
আমি কিছু বলার আগেই কবির লাইট অফ করে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। খুশি হয়েছিলাম। নিশ্চয়ই কবিরও আর দশটা ছেলেদের মতো নয়। ব্যক্তিত্ববান। অাস্তে আস্তে সম্পর্ক হতে তো বাঁধা নেই। তাছাড়া স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তো আর ফুরিয়ে যাবার না। দ্বিতীয় দিনেও স্বামী আমার সাধু পুরুষটি হয়ে রইলো। কেমন সুফী সুফী ভাব। মনে হচ্ছে কেউ ওকে দিব্যি দিয়েছে বলেছে, খবরদার! এই মেয়ের কাছ থেকে দশ হাত দূরে থাকবি। হাহা। ভাবলাম,  আমার সঙ্গে মজা করছে হয়ত। সারাদিন বাইরে কাটিয়ে রাত করে ফিরলো আমার জামাই। ক্লান্ত দেখাচ্ছিল ওকে। বিছানায় আসতেই ঘুমিয়ে পড়ল। ওর মুখ দেখে মায়া হলো। আহারে গুটু গুটু লক্ষ্মী বাবুটা আমার।

তৃতীয় দিন আমাদের বাড়ি আসি। রাতে অপেক্ষা করছি কবিরের জন্য। ওর কাছ থেকে কোনো সাড়া নেই। নিষ্প্রতিভ একটা মানুষ। জোর করতেই বলল, অপরিচিত জায়গা...।
- ওরে আমার লজ্জার জাহাজ...
না হেসে পারলাম না আমি।
চতুর্থ রাতেও আমার বিবাহিত জীবনের গল্প পাল্টালো না। কবির বলল, আমি মেয়েদের শরীরে অভ্যস্ত নই ফারহানা।
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। ভেতরে ভেতরে খুশি হলাম। ওর একটা হাত তুলে নিয়ে বললাম, গুড বয়। এখন থেকে অভ্যস্ত হয়ে যাবে...। 
- আসলে তুমি আমার ব্যাপারটা বুঝতে পারবে না। মুখে মে মাসের মেঘ জমিয়ে বলল কবির। আমি ফিক করে হেসে দিলাম। জোর করতেই ও সরে গেল।
- আচ্ছা বাবু সোনা, তুমি কি আরেকটু সময় চাচ্ছো?
- দেখি। তোমাকে জানাবো।
পাশ ফিরে বলল কবির। আমি পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম। কবির নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে ফেলল। রাগের বদলে হাসিতে পেট ফেটে আসতে চাইল আমার। কোনরকমে কবিরের পিঠে মুখ চাপা দিলাম। রাত কেটে গেল।

দিন যায়। রাত যায়।
সতেরতম দিনে ঈশ্বর মুখ তুলে চাইলেন। কবির জানে না, ওর ফেলে রাখা নাস্তাটুকু আমি কত্তো ভালোবাসা নিয়ে খাই। আজ মনে হয় অনেক সময় নিয়ে ওর অর্ধেক নাস্তাটুকু খেলাম। সারাদিন আমার খুব আনন্দ লাগল। দুপুরটা রান্না ঘরে কাটল। আচ্ছা কবিরের পছন্দের খাবার কী? লজ্জা লাগল আমার। স্বামীর পছন্দের খাবারটা এখনো জানি না। ধ্যাত্। ফোন করলাম ওকে। ফোনে ও যা বলল, শুনে তো আমি থ। আলু ভর্তা, ডাল আর ডিম ভাজি। আমার হাসি শুনে কবির যেন লজ্জা পেল। কিছু বলার আগে ফোন রেখে দেয় কবির।

বিকেলটা চড়ুই ডানায় ভর করে কেটে গেল। কবির ফিরল সন্ধ্যার পর। এর আগে কখনো ওর হাতে কিছু দেখিনি। আজ প্রথম। আইসক্রীম। ওকে তো বলা হয়নি- আইসক্রীম আমার খুউব প্রিয়।
রাত কেন বাড়ছে না। ভেতরে রাগ হচ্ছে আমার। শাড়ি পড়েছি অনভ্যস্ত হাতে। পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পেটের সামনে থেকে এখুনি খুলে পড়ে যাবে। কবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। 
- কেমন লাগছে তোমার বউকে? 
- সুন্দর।
- শুধুই সুন্দর? 
- হ্যাঁ সুন্দরই তো লাগছে। খারাপ লাগলে তো বলতাম।
- তোমার আর কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না? 
- কি বলছো উল্টাপাল্টা? কবির কথায় কপটতা ফুটাতে ব্যস্ত। কিন্তু পুরোপুরি সফল হলো না। আমি কবিরের কানে কানে আমার ইচ্ছেটার কথা বলতেই ও কেমন নিষ্প্রভ হয়ে গেল। চেপে ধরলাম।  কবির অসহায়ের কণ্ঠে বললো, আমারও ইচ্ছে হয়, কিন্তু সাহস হয় না...! 
- জানি তো সোনা।
- তুমি কিছুই জানো না ফারহানা-
- জানি না? বলো তাহলে-
- কিছু কথা থাকে যা স্ত্রীকেও বলতে বাধে...তাছাড়া
- স্ত্রী আর ডাক্তারের কাছে কথা চেপে লাভের চেয়ে ক্ষতি হয়। হাসি মুখে বলি। তবুও মুখ খুললো না কবির। জোর করতেই বলল, দাড়াও কাগজে লিখে দেই...। 
আমি দৌড়ে গেলাম কাগজ কলমে জন্য। ফিরেও এলাম দ্রুত। কবির অনীহাভরে হাত বাড়াল। বলি, তুমি তোমার কথা সুন্দর করে লিখে ফেল, আমি চা করে আনছি। 
ইচ্ছে করেই কিচেনে সময় নিলাম। রুমে ফিরে এসে দেখি কবির নেই। কোথায় গেল? ব্যালকনিতে বোধহয়। 
বিছানার ওপর কলম চাপা দেয়া কাগজটি দ্রুত হাতে তুলে নিলাম-
"ফারহানা, আই এ্যম ইউজড টু অব মাস্টারবেশন। ভয় হয়। যদি...!" 
আমি কিছুই বুঝলাম না। ছুটে গেলাম ব্যালকনিতে। নেই। নিশ্চয় বাথরুমে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম কবিরের জন্য...

রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০১৬

শিল্পী নাজনীন -এর অনুগল্প

বিকার
অনেকক্ষন থেকে ফোনটা বাজছে । বেজেই চলেছে । শব্দ নেই । মৃগীরোগীর কাঁপন নিয়ে অদ্ভুতভাবে কাঁপছে । রুবা । কোন সন্দেহ নাই । মেয়েগুলো এতো বোকা কেন হয় কে জানে ! মুদৃ হাসে দিব্য । আপন মনে বিড়বিড় করে । বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে অন্ধকার ছাদের দিকে চেয়ে থাকে । হাতের সিগারেট ওঠানামা করে তার । কি চায় রুবা? কেন সে নিজের গোছানো সংসার ছেড়ে, নিশ্চিত ভবিষ্যত ছেড়ে তার মত অপগন্ড লম্পটের হাতে সঁপে দিতে চায় নিজেকে ? বোকা মেয়েটা ! বড্ড সরল । কেন যে বোঝে না দিব্যকে ! সাত বছর আগেও এমনি বেজেছিল ফোনটা । সেদিনও ফোন ধরেনি দিব্য । ইচ্ছে করেনি । অদ্ভুত এক আলস্য গ্রাস করেছিল তাকে । ঠিক আজকের মতই । সেদিন সে আজকের মত নিস্পৃহভাবে বিছানায় চিৎ ছিল না অবশ্য । বরং অদ্ভুত এক আনন্দ আর অসহ্য ভাললাগা নিয়ে আড়াল থেকে দেখেছিল রুবার জলে ভেসে যাওয়া মুখ, অসহায়তার আর্তি, স্বপ্নভঙ্গের কষ্টে মুচড়ে যাওয়া রুবার তুলতুলে শরীর । আহ্ । কি যে আনন্দ হয়েছিল সেদিন ! তীব্র সুখে ভেসে গিয়েছিল তার দুঃখবিলাসী মন । সাথে সাথে রুবার প্রতি অদ্ভুত এক মায়ায়, করুণায় বিগলিত হয়েছিল তার অন্তর ! আহা ! বোকা মেয়েটা ! ভালবেসে সুখ নাই, বোকা মেয়েটা জানে না তা । জানে না, ভালবাসায় নয় বরং তার জলে ভেজা চোখেই যত সুখ দিব্যর । যন্ত্রনায় ছটফট করা রুবাতেই আগ্রহ যত তার । কিন্তু জানে নাইই বা কেন ! দিব্যতো গোপন করেনি কিছুই ! বরং প্রথম পরিচয়েই সে বলেছিল, সে আসলে মেয়ে পটানো টাইপ ছেলে, তার প্রেমিকারও কোন গোনাগুনতি নাই ।
দশ বছর আগে এক বন্ধুর সাথে দিব্য গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ইডেনের গেটে । খুব অবাক হয়ে তাকিয়েছিল গনগনে দুপুরের রোদে পুড়তে থাকা কলেজটার ময়লাটে শরীরের দিকে । এখানেই পড়তেন তবে লাবণ্য গুপ্ত ! জীবনানন্দের লাবণ্য গুপ্ত ! এখানেই ! অবাক বিস্ময় মেনে চেয়েছিল সে । তার লাবণ্য গুপ্ত কোথায় কে জানে ! পোড়াতেই আনন্দ তার, পুড়তেও । কে জানে কখন, আনমনে সে আবৃত্তি করতে শুরু করেছিল জীবনানন্দের ‘সুদর্শনা’ । তার ভরাট কন্ঠ আবৃত্তি করতে থাকে-
'একদিন ম্লান হেসে আমি
তোমার মতন এক মহিলার কাছে
যুগের সঞ্চিত পণ্যে লীন হতে গিয়ে
অগ্নিপরিধির মাঝে সহসা দাঁড়িয়ে
শুনেছি কিন্নর কণ্ঠ দেবদারু গাছে,
দেখেছি অমৃতসূর্য আছে।'
‘আপনি তো খুব ভালো আবৃত্তি করেন !’- রিনরিনে কণ্ঠটায় সচকিত হয় দিব্য । অপ্রস্তুত ও কিছুটা । তবে সামলেও নেয় দ্রুত । তারপর কণ্ঠটাকে আরও একটু কাঁপিয়ে, আরও একটু অনর্থক ভারী করে সে বলে, ‘ধন্যবাদ’ । আড়চোখে তাকায় । ছিপছিপে শরীরে কবিতার ঢেউ, ছন্দের দোলা । হুম ! তার জহুরী চোখ রত্ন চিনে নেয় নিমেষেই । পোড়া আর পোড়ানো কোনটাতেই ক্লান্তি নেই তার । দুঃখের সাথে সহবাস না হলে জীবন কি আর জীবন থাকে গো ! ম্যাড়মেড়ে, ছাতাপড়া সুখে বড় আপত্তি তার ! তার চাই দুঃখ, চাই অসুখের সাথে নিরন্তর সঙ্গম । তবেই না জীবন । তবেই তো মনে হবে বেঁচে আছি ! রুবা নিজের আগ্রহেই যেচে পরিচিত হলো । দিব্য আবৃত্তি শিল্পী, থিয়েটার করে । রুবা পটলো সহজেই । না, দিব্য বাধা দেয়নি । তবে হ্যাঁ, নিজের কিছু গোপনও করেনি সে । তার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, মেয়েপটানো স্বভাব, এমনকি নিষিদ্ধ পল্লী ! তবু রুবাকে থামানো গেলো না ! সে কি পুড়তেই চায় তবে ? চেয়েছিল? কে জানে ! রহস্য অপার!  ইডেনের সামনে ঘন ঘন টহল অতঃপর । রুবার রান্নায় সকাল দুপুর রাত্রি পার । রুবার টাকায় স্ফুর্তিতে মেয়েপটানো আরো। আহা ! মেয়েগুলো এত বোকা ! কি আছে তার ! কেন তার জন্য কেঁদে ভাসায়, তাকে পাবার নেশায় উন্মাদ হয় এমন ! ভারী দুঃখ হয় তারও !
রুবাও কেঁদে ভাসাল । তার বিয়ে । পাত্র ডাক্তার । কানাডায় থাকে । বিচ্ছেদের ব্যথায় বুকটা টনটন করে দিব্যর । তবু, দুঃখটুকু তার চাই, চাই যন্ত্রনার দহন । কিন্তু রুবাটা বোঝেনা । ভারী অবুঝ সে । দিব্যকে তাই কথা দিতে হলো, পরদিন সকাল দশটায় কাজী অফিসে থাকবে সে । হুম ! পাগল আর কি ! সে ছিল বৈ কি ! তবে আড়ালে । দারুণ আনন্দে ভাসতে ভাসতে, অসহ্য যন্ত্রনায় পুড়তে পুড়তে সে দেখেছিল রুবার জলে ভেজা মুখ, তার অপেক্ষার প্রহর গোনা, স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রনা নিয়ে অতঃপর চলে যাওয়া ।
কষ্ট, বড় কষ্ট । রুবাদের জন্য কষ্ট । নিজের জন্য কষ্ট । কষ্টই জীবন তবু । কষ্টই ঈশ্বর তার ! রুবা চলে গেল কানাডা । মন পোড়ে । বড্ড পোড়ে । আবার ফোন । আবার যোগাযোগ ! একমাস হলো দেশে ফিরেছে রুবা । আজ আবার সে সব গহনা আর জমানো টাকা নিয়ে অপেক্ষায় । প্রকৃতি বড় নির্দয় । ফোনটা সেই সেদিনের মতই কাঁপছে অসহ্য যাতনায় । ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে দিব্য । যেন সে তাকিয়ে আছে কোন কাঁকড়া কিংবা বিছের দিকে, অদ্ভুত কোন জন্তুর দিকে ! সিগারেট পুড়তে থাকে হাতে, পুড়তে থাকে সেও । ফোনটা কেঁপে কেঁপে থেমে যায় । রুবার কান্না কি থামে ? জানেনা দিব্য ।বুকের মধ্যে বন্য এক আনন্দ লাফায়, অসহ্য এক যন্ত্রনা দাপায় ! তার পোড়াতেই আনন্দ, পুড়তেও । আগুনই আরাধ্য তার, আগুনই নিয়তি !
________________

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৫

শিল্পী নাজনীন -এর অনুগল্প

অপেক্ষা
অনেকক্ষণ শূন্য গ্লাসটার দিকে আনমনে চেয়ে থাকে সে । কি দেখে সে ? শূন্য গ্লাস নাকি সেখানে তখনও থেকে যাওয়া জলের দাগ ? না, কিছুই দেখে না সে । কিচ্ছু না । তার মনটাও এখন অমনি শূন্য কি ? ঐ জলের গ্লাসটার মত ? জলটুকু নিঃশেষে পান করে ফেলে রেখে গিয়েছে কেউ, নিদারুণ অবহেলা ভরে । নাহ্ । মানুষের মনটা কখনও শূন্য হয় না আসলে । এবং হয় না বলেই, নিজের মানবজন্মকে নিজেই সে এখন অভিসম্পাত দেয় মনে মনে । মনের মধ্যে ভাবনাগুলো  সামান্য বুদবুদ তুলে হারিয়ে যেতে থাকে, নতুন ভাবনা আবার উঁকি দেয় । আহ্ ! জ্বালিয়ে মারে ।
পাবলিক লাইব্রেরির এই রঙজ্বলা ক্যান্টিনে আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবে সে ? কাঁহাতক আর সহ্য করা যায় এই পানসে, বিস্বাদ চায়ের অত্যাচার ! না, আর নয় । সে ঠেলে সরিয়ে দেয় চায়ের কাপ, নান আর ডালের এঁটো আর বেজার, আধময়লা কাঁচের বাসন । এই নিয়ে মোট ছ’কাপ চা আর দু-দুটো নান সেই সাথে একবাটি হালিম সাবাড় করেছে সে । না, ভুল । নান আর হালিম অনেকটাই পড়ে আছে, শুধু বিস্বাদ চায়ের অত্যাচার এড়াতে পারে নি । অন্যমনে খেয়ে ফেলেছে কখন, বুঝতে পারে নি । না, পান করেছে । কাউন্টারে বিল মিটিয়ে সে নিভু নিভু পায়ে বের হয় অতঃপর । এই নিয়ে মোট পাঁচদিন হলো, আসবে বলে এলো না জিতু । জিতু কি অন্য কারও প্রেমে পড়ল তবে ? মন মজল অন্য কোথাও? আচ্ছা, প্রেমে পড়াটা কি সহজ এতটাই ? জলে ঝাঁপ দেয়ার মত ? হবে হয়তো । যারা সাঁতারে পটু তারাই হয়ত উৎরে যায় শেষমেষ, বাকিরা তার-ই মত হাবুডুবু খায়, অহেতুক পেট ভরে জলে এবং অবশ্যই ডুবে মরে ।
একটা সময় ছিল যখন তার সাথে এক মিনিট কথা বলার জন্য, একটিবার দেখা করার জন্য ছটফট করত জিতু, অস্থির করে তুলত তাকে । অথচ এখন ! উল্টে গিয়েছে পাশার দান । সাঁতারে দারুণ পটু সে এখন  । অথচ, সে ! দিপা ! না, তার ভালোবাসায় তো চির ধরে নি একটুও । জিতু তাকে চায় না আর, স্পষ্ট বলেছে সে কথা । তবু বোকা সে, দিপা চেয়েছিল শেষবার অন্তত দেখা হোক, জিতু তাকে বলুক শুধু, কেন এত অবজ্ঞা তাকে, কেন এত অপমান । হ্যাঁ, অনেক অনুরোধে রাজি হয়েছিল জিতু এবং বাকি চারবারের মত-ই, অনিবার্যভাবেই, আজও আসেনি সে, ফোনটাও বন্ধ করে দিয়েছে, নির্দিষ্ট সময় পরে, অন্যান্য বারের মতই ।
বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে আসে তার । পৃথিবীটা খুব ফাঁকা হয়ে যায় যেন । চারপাশের এত শোরগোল, কোলাহল কিছুই আর স্পর্শ করে না তাকে । সে স্খলিত, মৃদুপায়ে হাঁটে, রাস্তা পার হয়, বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের সামনে এসে দাঁড়ায়, বাসের অপেক্ষা করে । যেন সে মানুষ নয় কোন, একটি যন্ত্র মাত্র । স্রেফ তাকে যেতে হবে তাই যাওয়া, ফিরতে হবে, তাই ফেরা । অকারণ, অর্থহীনভাবে সে যেন ক্রীড়নকের মত চলতে থাকে শুধু ।
নেমে আসা সন্ধ্যার ম্রিয়মান আলো হঠাৎই নিভে আসে যেন । আকাশ কালো হয়ে আসে সহসা । খুব শীতল, ঠান্ডা বাতাস বয়, চোখের মধ্যে উড়ে আসে একরাশ ধুলো । ধুলো মুছতে চোখ রগরায় দিপা, আকাশের দিকে তাকায় ।
আহ্ ! আকাশে এত আনন্দ ছড়ালো কে হঠাৎ ! কে আঁকল এত অসামান্য দৃশ্যপট! পুরো আকাশ ছেয়েছে কালো মেঘের চাদরে, তার নিচে উড়ছে ঝাঁকঝাঁক পাখির দঙ্গল । ঢাকা শহরে এত পাখিও কি ছিল কোনো দিন ? আছে ? আচ্ছা, ওগুলো কি কাক ? আহা! কাকও এত সুন্দর হয় তবে ! পাখিতে যেন ছেয়ে গেলো পুরো আকাশ, তারা উড়ছে তো উড়ছেই ! বিরাম নেই আর । বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ, আকাশের এই ঘনায়মান অন্ধকারের অসামান্য দৃশ্যপট আর হাজারো পাখির ডানা মেলে ওড়ার এই ছন্দ দিপাকে অনেক বছর পেছনে ফিরিয়ে নেয় সহসা। কিংবা অন্য আর এক জীবনে সে ফিরে যায় হঠাৎ । দিপার সামনে থেকে মুছে যায় ঢাকা শহর, নিভে যায় তার সব আলো, দূরে মিলিয়ে যায় কোলাহল, যানজট । সেখানে ভেসে ওঠে অন্য এক দৃশ্যপট, অন্য এক জীবন । দিপা সহসা আবিষ্কার করে সে ফিরে গিয়েছে তার সেই শৈশবে, দারুণ ঝড় উঠেছে হঠাৎ, দমকা বাতাস আর বৃষ্টির তোড়ে সে জবুথবু হয়ে নিজের ভিজে যাওয়া ফ্রকটাই উল্টিয়ে নিয়ে নিজেদের রান্নাঘরের পেছনের আমগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে শীতে আর ভয়ে কাঁপছে ঠকঠক ! মাঝে মাঝে, ঝড়ের তোড়ে আম পড়ছে ঝুপ করে । সব ভয়, সব উৎকন্ঠা ভুলে সে দৌড়ে গিয়ে আবছা আঁধার হাতড়ে তা রাখছে ভাঙ্গা ঝুড়ির কোনে । গরুটা ভয়ে হাম্বা রবে কাঁদছে ভীষন, রান্নাঘরে মা চিৎকার করে ডাকছে তাকে দিপা, দিপা, তাড়াতাড়ি ঘরে আয় বলে । কিন্তু সে ঝড়ের প্রকোপ, বৃষ্টির ছুঁড়ে দেওয়া শীত আর ঘনায়মান সন্ধ্যার সেই অসামান্যতায় বিস্ময়ে আর ভয়ে বোবা হয়ে সেই আমগাছটার নিচেই দাঁড়িয়ে থাকে ছবির মত, বিভূতিবাবুর দূর্গার মত !
বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটায় চমকে ওঠে সে । কোথায় কি ? সে দাঁড়িয়ে আছে শাহবাগের মোড়ে, ঢাকার রাস্তায় তেমনি যানজট, কোলাহল, ধোঁওয়া । আজান হচ্ছে । মাগরেবের সময় হলো । কমে এসেছে দমকা বাতাসের তোড় । বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে । সে ভিজছে । গাড়িটা আসেনি এখনও । সে অপেক্ষা করে । জিতুর দেওয়া টুকরো আঁধার আর ছায় না মন । কোন এক হীরন্ময় আলোয় ডুবে যায় সে, ভিজে যায় তার পিপাসার্ত মন, যা জিতুরা কখন ও ভেজাতে পারে না । দিপা অপেক্ষা করে, বাসের, নতুন দিনের।
_________________________