রক্তিম মিলন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রক্তিম মিলন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

কয়েকটি গীতি কবিতার বঙ্গানুবাদ

বব ডিলান (Bob Dylan):

জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৮১ সালের ২৪ মে। তাঁর জন্ম স্থান ডুলুথ, মিনেনসোটা, আমেরিকা। তিনি মূলত গায়ক, গীতিকার ও সুরকার। তাঁর রচিত গান গীতি কবিতা হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি ২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল অর্জন পুরষ্কার করেছেন। তাঁর বিখ্যাত কয়েকটি গীতি কবিতার অনুবাদ করা হল।
_____




উত্তরের দেশের মেয়ে || Girl From The North Country


ও, তুমি যদি যাও দেখতে উত্তরের দেশের মেলা
প্রচন্ড বায়ুর দিক যেখানে সীমান্ত রেখা
সেখানকার একজনকে মনে করিয়ে দিয়ো আমার কথা
এক সময় সে ছিল আমার সত্যিকারের ভালবাসা।

ও, তুমি যদি যাও যখন তুষার ঝড়
যখন নদীর পানি জমে যায় গরমের শেষে
দয়া করে দেখে নিয়ো, পরেছে কি নাসে গরমের কাপড়
প্রচন্ড ঝড়ো বাতাসে সুরক্ষিত রাখতে নিজেকে।

দয়া করে আমার হয়ে দেখে নিয়ো ঝুলে আছে কি না তাঁর লম্বা চুল
দেখে নিয়ো বেনি হয়ে নেমেছে কিনা স্তনে
দয়া করে আমার হয়ে দেখে নিয়ো ঝুলে আছে কি না তাঁর লম্বা চুল
তাঁকে আমার এভাবে মনে পড়ে।

আমি অবাক হয়ে যাব, আমার কথা যদি তাঁর আদৌ মনে পড়ে
বহুবার আমি প্রার্থনা করেছি 
আমার রাতের অন্ধকারে
আমার দিনের আলোতে।

তাই, তুমি যদি যাও দেখতে উত্তরের দেশের মেলা
প্রচণ্ড বায়ুর দিক যেখানে সীমান্ত রেখা
সেখানকার একজনকে মনে করিয়ে দিয়ো আমার কথা
এক সময় সে ছিল আমার সত্যিকারের ভালবাসা।


ঝড় থেকে আশ্রয়ে || Shelter From The Storm


সেখানে জীবন ছিন অন্যরকম, এক প্রকার পরিশ্রান্ত এবং রক্তাক্ত
যখন গুণ ছিল কৃষ্ণত্ব এবং রাস্তা ছিল কর্দমাক্ত।
আমি বন্যতা থেকে এলাম, আকার বিহীন একটি সৃষ্টি
“ভেতরে এসো” বলে তিনি জানালেন, “আমি তোমাকে ঝড় থেকে আশ্রয় দেব”।

এবং আমি মারা গেলে, পুনরায় তুমি নিশ্চিতভাবে পার বিশ্রাম নিতে
আমি তাঁর জন্য সর্বোচ্চ করব, সে কথাই দিয়েছি তাঁকে
ইস্পাত চক্ষু-মৃত-পৃথিবী, এবং যে মানুষেরা উষ্ণ হবার জন্য লড়াইরত
“ভেতরে এসো” বলে তিনি জানালেন, “আমি তোমাকে ঝড় থেকে আশ্রয় দেব”।

আমাদের মাঝে কোন কথা হয়নি, সেখানে ছিল কিছুটা ঝুঁকি
সেই হিসেবে এখনো অমিমাংসিত অনেক কিছু।
একটা জায়গার কথা চিন্তা কর যেখানে সব সময় শান্তি এবং উষ্ণতা
“ভেতরে এসো” বলে তিনি জানালেন, “আমি তোমাকে ঝড় থেকে আশ্রয় দেব”।

ঢাকা পড়লাম শান্তিতে, ক্লান্তি থেকে অবমুক্ত করল আমায়,
অবিমিশ্রিত হলাম ঝোপের ভিতর এবং উড়ে গেলাম সমীরণ রেখায়
যেন তাড়া খাওয়া কুমির শস্যক্ষেত নষ্ট করে পালিয়েছে।
“ভেতরে এসো” বলে তিনি জানালেন, “আমি তোমাকে ঝড় থেকে আশ্রয় দেব”।

হঠাৎ আমি ঘুরে দাঁড়ালাম এবং তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
কোমরে রূপালি কোমরবন্ধ এবং খোঁপায় ফুল 
তিনি আমার দিকে দরদ নিয়ে এগিয়ে এলেন এবং কাঁটার মুকুট তুললেন
“ভেতরে এসো” বলে তিনি জানালেন, “আমি তোমাকে ঝড় থেকে আশ্রয় দেব”।

তখন আমাদের মাঝে একটি দেয়াল, সেখানে কিছু হারিয়েছে
আমি বেশ আবেশ নিলাম, এবং সংকেত পেলাম অতিক্রম করার
ঠিক যেন ভুলে যাওয়া দীর্ঘ সকাল থেকে চিন্তার শুরু
“ভেতরে এসো” বলে তিনি জানালেন, “আমি তোমাকে ঝড় থেকে আশ্রয় দেব”।

রুক্ষ পথে হাঁটছে সহকারী আর অগ্রবর্তীজন পাহাড়ে উঠছে
কিন্তু কিছুই ধর্তব্য নয়, শুধু মৃত্যু গণনাযোগ্য
এবং একজন বাম চোখা ডোম, সে বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছে
“ভেতরে এসো” বলে তিনি জানালেন, “আমি তোমাকে ঝড় থেকে আশ্রয় দেব”।

একটি ছোট পাহাড় টিলার গ্রামে তাঁরা আমার জামা কাপড় বাজি রাখল
আমি মুক্তির জন্য কথা বললাম এবং তাঁরা আমাকে মৃত্যুর ওষুধ দিল
আমি সরলতা প্রদর্শন করলাম এবং পেলাম গালমন্দ
“ভেতরে এসো” বলে তিনি জানালেন, “আমি তোমাকে ঝড় থেকে আশ্রয় দেব”।

হ্যাঁ, আমি বিদেশে বসবাস করছি কিন্তু আমি সীমান্ত পেরিয়ে যেতে বাধ্য
সৌন্দর্য ক্ষুরের ডগা একদিন আমি নিজের করে নেব
যদি আমি তাঁর এবং স্রষ্টার জন্মের সময়কে ঘুরিয়ে দিতে পারি।
“ভেতরে এসো” বলে তিনি জানালেন, “আমি তোমাকে ঝড় থেকে আশ্রয় দেব”।


স্বর্গের দরজায় কড়া নাড়ছি || Knocking on Heaven’s Door


মা, খুলে নাও এই ব্যাজ আমার
এটি ব্যবহার করতে পারব না আর আমি
ঘনায়মান অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছি না আর
মনে হয় স্বর্গের দরজায় কড়া নাড়ছি।

ঠক-ঠক করে কড়া নাড়ছি স্বর্গের দরজায়
ঠক-ঠক করে কড়া নাড়ছি স্বর্গের দরজায়
ঠক-ঠক করে কড়া নাড়ছি স্বর্গের দরজায়
ঠক-ঠক করে কড়া নাড়ছি স্বর্গের দরজায়


মা, আমার বন্দুকগুলো রেখে দাও মাটিতে
গুলি করতে পারছি না আর আমি
সেই ঠাণ্ডা কালো মেঘ নেমে আসছে
মনে হয় স্বর্গের দরজায় কড়া নাড়ছি।


ঠক-ঠক করে কড়া নাড়ছি স্বর্গের দরজায়
ঠক-ঠক করে কড়া নাড়ছি স্বর্গের দরজায়
ঠক-ঠক করে কড়া নাড়ছি স্বর্গের দরজায়
ঠক-ঠক করে কড়া নাড়ছি স্বর্গের দরজায়


সময়গুলো বদলে যাচ্ছে || The Times They Are A-Changin’


এসো দাঁড়াও জটলা বেঁধে
তোমরা যেখানেই যাচ্ছ হেঁটে
এই কথা মেনে নাও পানি
জমছে তোমাদের চারিদিকে
এবং স্বীকার করে নাও
ডুববে তুমি পানিতে।
যদি তোমার সময় বেঁচে থাকার মত হয়
তুমি বরং সাঁতার কাটো, নয়তো ডুববে পাথরের মত।
সময়গুলো বদলে যাচ্ছে।

এসো লেখক, সমালোচক 
যারা লেখনীতে ভবিষ্যত দেখো
এবং দৃষ্টি প্রসারিত করো।
সুযোগ পুনরায় আসবে না
এবং এতো দ্রুত কিছু বলো না
চাকা এখনো ঘূর্ণায়মান
এবং বলা যায় না কারো নাম
এখনকার পরাজিত একটু পরে বিজয়ী হতে পারে
সময়গুলো বদলে যাচ্ছে।

এসো সংসদ সদস্য, নেতৃবৃন্দ
কান পেতে ডাক শুনো
দরজায় দাঁড়িয়ে থেকো না
হল ঘরের ভেতর ভিড় করো না।
সে চোট পাবে 
যে দাঁড়িয়ে থাকবে জটলা করে
জানলাগুলো নড়ে উঠবে, কম্পিত হবে দেয়ালগুলো
সময়গুলো বদলে যাচ্ছে।

এসো মায়েরা, বাবারা
মাঠের ভেতর দিয়ে।
এবং সমালোচনা করো না
যেটা বোঝো না
তোমাদের ছেলেরা এবং মেয়েরা
তোমাদের আজ্ঞাধীন থাকবে।
পুরোনো রাস্তাগুলো দ্রুত ভেঙ্গে পড়বে
দয়া করে নতুন পথ থেকে সরে দাড়াঁও যদি কাজে হাত না লাগাও।
সময়গুলো বদলে যাচ্ছে।

রেখাটি আঁকা হচ্ছে
অভিশাপ মুছে যাচ্ছে।
ধীর গতির একটি 
পরে দ্রুত হবে।
এখনকার বর্তমান 
পরে অতীত হবে।
ক্রমগুলো বদলে যাচ্ছে 
এবং এখন যে প্রথম পরে তাঁর হবে শেষ অবস্থান।
সময়গুলো বদলে যাচ্ছে।

রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৬

রক্তিম মিলন -এর প্রবন্ধে রবীন্দ্র ভাবনা

রবীন্দ্রনাথ এখন আভিজাত্যের হাতে বন্দী


পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা পূর্ববঙ্গের লোকদের বাঙ্গাল বলে গালি দিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিকৃত এবং ভাঙা উচ্চারণে পাকিস্তানী সেনারা গালিটা সমগ্র বাঙালিদের দিত। গালিটা স্থায়ীভাবে থেকে গেছে। তবে সমগ্র বাঙালির জন্য নয়। এই গালি এখন দেয়া হয় শুধু চাষাভূষাদের জন্য। এই বাঙালদের জন্য রবীন্দ্রনাথ দরদ দিয়ে ভেবেছেন। রাশিয়ার চিঠিতে তিনি লিখেছেন, 'চাষীকে আত্মশক্তিতে দৃঢ় করে তুলতে হবে, এই ছিল আমার অভিপ্রায়।' খুব দরদ ভরে তাদের উন্নতির কথা চিন্তা করে তিনি লিখেছেন, 'সমবায়নীতি অনুসারে চাষের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে না পারলে কৃষির উন্নতি হতেই পারে না।'

প্রাবন্ধিক যতীন সরকারের মতে, সোনারতরী কবিতার সরল বর্ণনাটি হল- একজন কৃষক তাঁর সোনা ধান নিয়ে পাড়ে বসে আছে নদী পার করবার প্রত্যাশায়। একজন মাঝি এসে তাঁর ফসল তুলে নিল। এবার কৃষক নৌকায় উঠবে। উঠতে গিয়ে দেখে নৌকায় তিল  ধারণ করবার মত আর কোন জায়গা খালি নাই। মাঝি তাঁর সমস্ত ফসল নিয়ে চলে যায়। পাড়ে কৃষক একা বসে থাকে।

এই বর্ণনা থেকে কবিতার তাৎপর্য এভাবে বলা যায়- কৃষক তাঁর আপন শ্রমে উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য ভাগ থেকে বঞ্চিত। কবিতাটি শ্রমিকের ক্ষোভের ধারা বর্ণনা। অথচ অভিজাত সংস্কৃতিতে কবিতার এই আবেদনটি নেই। হারিয়ে গেছে। মহাকাল ব্যক্তিকে নিয়ে যায়, সমস্ত কীর্তি রেখে যায়- নানান সব কথার ভিড়ে এভাবেই মূল কথা হারিয়েছে।

রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা কৃষকে এই রবীন্দ্রনাথের সাথে কেউ পরিচয় করিয়ে দেয় না। শহুরে আভিজাত্যে বন্দী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কোন অভিজাত আবৃত্তিকার কবিতাটি আবৃত্তি করলে হয়তো রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করা হয়। রবি ঠাকুরের মহাপ্রয়ান পালন করা হয়। কিন্তু কোনভাবেই রবীন্দ্র চর্চা সুসম্পন্ন হয় না। বাঙ্গালারা চিনতে পারে না প্রকৃত রবীন্দ্র সত্তা। অভিজাতন্ত্রে রবীন্দ্রনাথ হারিয়ে গেলে ‘বাঙাল’ গালি বুমেরাং হয়ে ফিরে যাবে শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে! (অথবা স্বয়ং রবী হারিয়ে যাবে।)

নানা রকম আনুষ্ঠানিকতায় রবীন্দ্রনাথের জন্ম দিবস, প্রয়ান দিবস পালিত হয়। কিন্তু পালন করা হয় না রবীন্দ্র চেতনা। রবীন্দ্রনাথের চেতনা, ভাবনা সব আড়ালে থেকে যায়। রবীন্দ্রনাথের রক্ত করবী, রথের রশি, অচলায়তন প্রভৃতি সব রচনা যাদের জন্য তাঁরা আদতে না পারে এসব নাটক মঞ্চস্থ করতে, না পারে নাটক দেখতে। অবশ্য বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে উক্ত দিবস দু‘টি উপলক্ষে তাঁর নাটক, গল্প, উপন্যাস, কবিতা থেকে নানা রকম অনুষ্ঠান প্রচারিত হতে দেখা যায়। কিন্তু বিজ্ঞাপনের ভারিক্কিতে আয়োজনের মূল আবেদনটি থাকে বলে মনে হয় না। আবার শহুরে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিজেদের ক্রিয়াশীলতা আর সংগঠনের অহংবোধ বাড়াতে তাঁর বিশেষ দিনগুলোতে মহা ব্যস্ত হয়ে পড়লেও না খেয়ে থাকা কৃষককুল অথবা ফসলের ন্যায্য দাম বঞ্চিত কৃষকের কোন খোঁজ রাখে না। তাতে সোনার তরী বা অন্যান্য রচনার উপযোগিতা কতটুকু থাকে?

রবীন্দ্রনাথের রক্ত করবী নাটকের কথা উল্লেখ করা যাক। শহুরে সংস্কৃতি চর্চায় ব্যস্ত নাট্যগোষ্ঠী বা সংগঠনগুলো এই নাটকের শততম মঞ্চায়ন বা তারো অধিকবার মঞ্চায়ন সম্পন্ন করেছে। কিন্তু কতবার তাঁরা গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সামনে করেছে! তাঁদের নাটক শহুরে শিল্পকলা একাডেমিতে আবদ্ধ হয়ে পড়লে রবি ঠাকুরের চিন্তার প্রসার ঘটবে না। রবির চিন্তা বইয়ের পাতা আর সাংস্কৃতিক আভিজাত্যে মাথা কুটে মারা যাবে।

রক্ত করবী নাটকের কাহিনী সারমর্ম বলা যাক- এই নাটকে শোষিত মানুষের মুক্তির লড়াই আছে। বিশু, কিশোর চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে রবী সে কথাই বারবার বলতে চেয়েছেন। ধনবাদী ব্যবস্থার বিপরীতে নাটকের সমস্ত সংলাপ, কথকতা। কিন্তু বর্তমানে নাটকটির মূল অর্থ অভিজাত নাট্যগোষ্ঠীর কাছে আর নেই। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন্দিনীর প্রেমের উপর ফোকাস ফেলতে গিয়ে তাঁরা (অতি সম্মানী নাট্যকাররা আসলে তাঁহারা) নাটকের মূল অর্থ বদল করে দিয়েছে। এরফলে দর্শকরা নাটকটি হয়তো দেখে কিন্তু তাঁরা দার্শনিক সত্যতা বুঝতে পারে না, উপলব্ধিও করতে পারে না।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৫তম মহাপ্রয়ান উদযাপন উপলক্ষে নিজস্ব ভাবনা। বাঙালদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বাঙালদের কাছে পৌঁছাক।

শুক্রবার, ২৯ জুলাই, ২০১৬

রক্তিম মিলন -এর কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ

কবিতা পড়ি। কবিতা পড়ি না। কেন কবিতা পড়ি না?




কবিতায় প্রেম, দ্রোহ, অনুরাগ, বিরাগ, ভালবাসা সব কিছু থাকে। এই থাকা বড় জটিল। জটিলতায় কবিতা প্রবহমান। এই জটিলতা পাঠকের নিকট কবিতার অর্থ আর কবিতার তথ্য ও তত্ত্বে। কারণ কবিতায় যে তথ্যের যোগান দেয়া হয়, সেই তথ্য থাকে একটি মোড়কের ভিতর। পাঠককে নিজ দায়িত্বে সেই মোড়ক খুলতে হয়। কবি সেই দায়িত্ব এড়িয়ে কবিতা লেখেন। নজরুল কবিতায় লিখেছেন, 'আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার'। কিন্তু নজরুল কবিতায় 'ইস্রাফিল' এবং তাঁর 'শিঙ্গা'কে পাঠকের নিকট পরিচিত করাননি। নজরুলের কবিতায় মিথ ও পৌরাণিক চরিত্রের ব্যবহার পাঠককে নিযে যায় সুদূর অতীতে। কবিতার লাইন 'ভীম রণ-ভূমে রণিবে না'। কবিতা পড়তে পড়তে মহাভারতের ভীমকে চেনা যায় না। কবিতার ভীম নিজ পরিচয়ে থাকেন মহাভারত নামক মহাকাব্যে আর বিদ্রোহী কবিতায় আছেন একটি মোড়কে। পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে এই মর্মোদ্ধার এবং পরিচয় উদ্ধার অসম্ভব।

 কবিতার তত্ত্বে কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওর্থ বলেছেন, সকল কবিতা হচ্ছে কবির শক্তিশালী আবেগের উদগিরণ। তাঁর মতে কবিতা সৃষ্টি হয় কবির ভিতর জমা হওয়া আবেগের গভীর প্রবাহ থেকে। এই তত্ত্বে কবির বিখ্যাত অনেক কবিতা সৃষ্টি হয়েছে। পাঠক সাদরে এবং সোগ্রাসে তাঁর কবিতা পড়ছে এবং পড়বে। তাঁর কবিতা টেমস, রাইন, হাডসন নদীর পাড় থেকে বঙ্গভূমের পদ্মা, মেঘনা, যমুনা পাড়ের মানুষজনও পড়ে। কিন্তু কবিতায় তাঁর তত্ত্বকে প্রত্যাখান করেছেন আরেক বিখ্যাত কবি টি.এস. ইলিয়ট। তাঁর মতে কবিকে কবিতা লিখতে হলে ব্যক্তিগত আবেগ পরিহার করে অন্য আবেগ ধারণ করতে হবে। এই আবেগ হবে ব্যক্তি সত্তা বিসর্জন। আত্মসত্তা এবং ব্যক্তিকসত্তা পরিহারের মধ্য দিয়ে কবি হয়ে উঠবেন পরিপূর্ণ। কবিতার তত্ত্বে কবিদ্বয় পরস্পর বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করলেও পাঠক সমাজ তাঁদের দুজনকেই সমাদরের সহিত গ্রহণ করেছে। তাঁদের কবিতা আনন্দের সাথে পড়ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নির্ভুল কে? নির্ভুলতার বিচারে পাঠক নৈর্ব্যক্তিক থেকেছে। পাঠক সমাজ অজান্তেই অ্যারিস্টটলের মতবাদকে মেনে নিয়েছে। নির্ভুলতার প্রশ্নে অ্যারিস্টটল তাঁর কাব্যতত্ত্ব গ্রন্থে জানিয়েছেন, 'নির্ভুলতার মানদন্ড কাব্যে এবং রাজনীতিতে বা অন্যান্য শিল্পকর্মে আলাদা আলাদা'। নৈর্ব্যক্তিক পাঠক সমাজ বিভিন্ন শিল্পের শিল্পগুণ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার দায়িত্ব যেমন এড়িয়ে গেছে তেমনি এড়িয়ে গেছে দুই কবির কবিতা তত্ত্ব। পাঠককুল তাঁদের তত্ত্বের কপচানো তেতো আলোচনা থেকে বেরিয়ে গ্রহণ করেছে সৃষ্ট কবিতা সম্ভার।

পারস্পরিক বিরোধিতা শুধু ওয়ার্ডসওর্থ এবং ইলিয়টের মধ্যেই থেমে থাকেনি। তত্ত্বের বিরোধিতা করেছেন গুরু এবং শিষ্য। অ্যারিস্টটলের গুরু প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবিদের বিতাড়িত করতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, চরিত্র গঠনে সাহিত্যের প্রভাব হানিকর। কিন্তু প্লেটোর একাডেমিতে অধ্যয়নকারী, দীর্ঘ ঊনিশ বছর তাঁর সঙ্গে সময় কাটানো ছাত্র অ্যারিস্টটল উক্ত মতবাদ প্রত্যাখান করে বলেছেন, সাহিত্য সত্য নির্ভর। এবং প্রমাণ করেছেন সাহিত্যের প্রভাব মূলত শুভ। তাঁর দৃষ্টিতে কবিরা ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা করেন না, ঘটতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইঙ্গিতও করেন।

কবিতা পাঠে নিরন্তর আনন্দ লাভ হয়। পাঠক পুলকিত হবার জন্য কবিতা পড়ে। কিন্তু পুলক আর পুলকিত হবার শিহরণ কমছে নানা কারণে। কবি নিজ আনন্দে কবিতা লেখেন। বর্তমান ইনফরমেশনের যুগে কবিতায় পাঠকের এক প্রকার অরুচি তৈরি হয়েছে। এই অরুচির কারণ তথ্য যুদ্ধ (ইনফরমেশন ওয়ার)। পাঠক সরাসরি তথ্য (ইনফরমেশন) চায়। পাঠককুল কর্মব্যস্ত বিশ্বায়নে নিছক আনন্দযজ্ঞে গা ভাসাতে চায় না। তাঁরা কবিতার জন্মান্তরের ভিতর দিয়ে তত্ত্ব বা তথ্য নিতে অনিচ্ছুক। কারণ কালিদাসের যুগ পেরিয়ে এখন ইন্টারনেটের যুগ চলছে। প্রযুক্তির রসহীন বাস্তবতায় মানুষ দুর্বোধ্যতায় থাকতে চায় না। কিন্তু কবিতায় এরকম চলে হারহামেশাই। একটু ব্যাখ্যা করা যাক, রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীতে বিশু গেয়েছে, 'তোর প্রাণের রস শুকিয়ে গেলে ওরে….'। আবার এই একই গান গীতবিতানে আছে। এবং এই সর্বনামের ব্যবহারে পাঠক থৈ হারিয়ে ফেলে। রবীঠাকুরের ‘তোর‘, ‘তুমি‘ কে? প্রেমিক না স্রষ্টা। এই সমূহ দোলাচলে সাধারণ পাঠক বলে বসে, ভাই কবিতা বুঝি না, তাই কবিতা পড়ি না, এত জ্ঞান আমার নাই, কবিরা কীভাবে এতসব লেখে, ইত্যকার নানা মন্তব্য। আর সমূহ মন্তব্যের ভারে চাপা পড়ে কবিতার স্বাদ।

দি নেসেসিটি অব আর্ট গ্রন্থে আর্নস্ট ফিশ্চার লিখেছেন, 'ধ্রুপদী সাহিত্যের যুগে কবিতা অত্যন্ত মনোরম ও আকর্ষণীয় চিন্তা বা আবেগ। কবিতা ভাষা তৈরির কারখানা।'

মানুষ আনন্দ পেতে নতুন নতুন কবিত লেখে। কবিতায় নতুন তত্ত্বের জন্ম দেয়। গ্রহণ ও বর্জনের মধ্য দিয়ে কবিতা এগিয়ে যায়। মানুষজন বুঝে না বুঝে কবিতা পড়ে। আবার খুব ভাল করে বোঝার জন্য গবেষক হয়। অনুসন্ধান করে নতুন বিষয় তুলে আনে। কিন্তু একই সাথে বিশ্বায়নের কর্মব্যস্ততা মানুষকে কবিতাহীন করে তোলে।